মুসলিম বাহিনীর মধ্যে সেরা অশ্বারোহী সাহাবি ছিলেন আবু কাতাদা আল আনসারি (রা.)। তাঁর নাম ছিল মূলত হারিস। কেউ কেউ ‘আমর’ও বলেছেন। উপনাম আবু কাতাদা।
এ নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। পিতার নাম রিবঈ ইবনে বালদামা, মাতার নাম কাবশা বিনতে মুতাহহির। পিতা-মাতা দুজনই খাযরাজ গোত্রের বনু সালামা শাখার সন্তান। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৭৮; তাহজিবুল কামাল, খণ্ড-৩৪, পৃষ্ঠা-১৯৪; আল-ইসাবা, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা-২৭২)
তিনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেন, তা নির্দিষ্ট নয়।
রাসুল (সা.) তাঁকে বিভিন্ন অভিযানে প্রেরণ করেছেন, কখনো নেতা হিসেবে, কখনো অধীন যোদ্ধা হিসেবে। অষ্টম হিজরির শাবান মাসে গাতফান গোত্রের বিরুদ্ধে ১৫ সদস্যের একটি অভিযানে তিনি ছিলেন কমান্ডার।
অতর্কিত আক্রমণে তিনি শত্রুকে পরাস্ত করেন। ১৫ দিনের মধ্যে যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। তাঁরা ২০০ উট, দুই হাজার ছাগল ও বহু বন্দি নিয়ে মদিনায় ফেরেন। ‘খুমুস’— অর্থাৎ এক-পঞ্চমাংশ আলাদা করে বাকি সম্পদ যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন ছিল তিনি মহানবী (সা.)-এর বিশেষ দোয়া লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
একবার রাতভর সফর করার কারণে রাসুল (সা.)-এর চোখে তন্দ্রা আসে। যার ফলে মহানবী (সা.)-এর তিনবার বাহন থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়, আর প্রতিবার আবু কাতাদা (রা.) তাঁকে ঠেস দিয়ে রক্ষা করেন। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’ তিনি বললেন, ‘আবু কাতাদা।’ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কতক্ষণ ধরে তুমি এমন করছ?’ তিনি বললেন, ‘সারা রাত।’ তখন রাসুল (সা.) খুশি হয়ে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন, যেমন তুমি আল্লাহর নবীকে হেফাজত করেছ।’ (মুসলিম : ১/২৩৯)
মহানবী (সা.)-এর বিশেষ দোয়াপ্রাপ্ত এই সাহাবি ভীষণ পরোপকারী ও দয়ালু ছিলেন। একবার রাসুল (সা.) এমন ব্যক্তির জানাজা পড়তে অস্বীকৃতি জানান, যিনি ঋণ রেখে মারা গেছেন। তখন আবু কাতাদা (রা.) ওই ঋণের দায়ভার নিজের ওপর নেন। এরপর নবী (সা.) তাঁর জানাজা পড়ান। (মুসনাদে আহমাদ : ২২/৬৫, ৩৭/৩২৮)
এভাবে অন্য একটি ঘটনায় একবার তাঁর কাছে এক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ধরা পড়ে এবং কেঁদে বলে, ‘আমি অসহায়।’ তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, এবং তিনি তার ঋণ মাফ করে দেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্তকে অবকাশ দেয় বা ক্ষমা করে দেয়, কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৩৭/৩০৮; মুখতাসার তারিখে দিমাশক : ২৯/১১৫-১১৬)
শুধু মানুষ নয়, অন্যান্য প্রাণীর প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদয়। একদিন পুত্রবধূ কাবশা তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলেন। একটি বিড়াল এসে তা পান করতে লাগল। তিনি পাত্রটি কাত করে দিলেন, যেন সহজে পান করতে পারে। তিনি বললেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, বিড়ালের উচ্ছিষ্ট নাপাক নয়; কারণ এরা ঘরের বাসিন্দা।’ (আবু দাউদ : ১/১০-১১; নাসাঈ : ১/১০-১১, ৪০)
রাসুল (সা.)-এর সাহচর্যে তিনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, কিন্তু হাদিস বর্ণনা করেছেন খুব সতর্কতার সঙ্গে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা রটনা করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন ঠিক করে নেয়।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ৪/৮০)
তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ১৭০। তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন বিশিষ্ট সাহাবি ও তাবেঈগণ। যেমন—আনাস ইবনে মালিক (রা.), জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.), সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব (রহ.) প্রমুখ। (আসহাবে রাসুলের জীবনকথা: ৩/১২৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৭৮)
ইন্তেকাল
তাঁর ইন্তেকালের সাল নিয়ে মতভেদ আছে। একদল বলেন, ৩৮ হিজরিতে কুফায়, আলী (রা.)-এর খিলাফতের সময়ে;
অন্যরা বলেন, ৫৪ হিজরিতে, ৭০ বছর বয়সে মদিনায়। পরের মতই গ্রহণযোগ্য।
কারণ ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলেও জীবিত ছিলেন। তাঁকে বনু সালামা গোত্রের কবরস্থানে দাফন করা হয়। ৭০ বছর বয়সেও তাঁর চেহারা ছিল ১৫ বছরের যুবকের মতো তরুণ। (আল-ইসাবা : ৭/২৭৪; মুখতাসার তারিখে দিমাশক : ২৯/১১৩-১১৭)